ভূমিকা
মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক একটি জটিল বিষয়, যা প্রায়ই কুরআনের কিছু নির্দিষ্ট আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। প্রচলিত একটি দাবি হলো—কুরআন মুসলমানদেরকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অন্যান্য ধর্মের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছে। মূলত এটি কিছু আয়াতের অপ্রাসঙ্গিক আক্ষরিক অনুবাদ থেকে উদ্ভূত একটি ভুল ধারণা। এই আয়াতগুলোর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, এগুলো ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ওপর নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং যুদ্ধ ও অস্তিত্বের সংকটের সময় রাজনৈতিক ও সামরিক জোটের বিষয়ে কৌশলগত নির্দেশনা।
ভাষাগত বিশ্লেষণ: ‘আউলিয়া’ বনাম ‘সাদিক’
কুরআনের আরবি শব্দ আওলিয়া যেটি আসলে ওয়ালি শব্দটির বহুবচন – এই শব্দের ভুল ব্যাখ্যার কারণেই প্রধানত এই সমস্যাটির সৃষ্টি হয়। প্রথমত, একটি বহুবচন শব্দ ব্যবহার করার মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হচ্ছে যে এখানে একক ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সম্পর্ক বুঝানো হচ্ছে না। যদিও এই শব্দটির একটি অনুবাদ হলো “বন্ধু”, তবে এই আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে এই শব্দটি পরিষ্কারভাবে “রাজনৈতিক জোট বা মিত্র,” “পৃষ্ঠপোষক বা সুরক্ষা প্রদানকারী” সংগঠন বুঝায় – এই শব্দটি দ্বারা গভীর রাজনৈতিক আনুগত্য এবং পারস্পরিক সামরিক সমর্থনের একটি বন্ধনকে নির্দেশ করে – কৌশলগত অংশীদারদের মধ্যে যে ধরনের সম্পর্ক হয় ঠিক সেরকম। কুরআনে ব্যক্তিগত বা সামাজিক বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সাদিক বা খালীল শব্দ ব্যবহৃত হয়। এই বিষয়ে ভাষাগত পার্থক্য অনুধাবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন যখন অমুসলিমদের ‘আউলিয়া’ হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করে, তখন এটি প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক বা ব্যবসায়িক লেনদেন নিষিদ্ধ করে না; বরং এটি এমন কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক জোটের বিরুদ্ধে সতর্ক করে যা মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
মূল আয়াতের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ
এই আয়াতগুলোর সত্যিকার অর্থে বোঝার জন্য, যেই সময়ে এই আয়াতগুলি নাযিল হয়েছিল সেই সময়ের পরিস্থিতির প্রাসঙ্গিক ব্যাপারগুলো জানতে হবে যাকে ইসলামিক স্টাডিস-এ আসবাব আল-নুজুল বলা হয়। নিম্নলিখিত আয়াতগুলি, মুহাম্মদ (সাঃ) এর সময় মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছিল যখন তীব্র রাজনৈতিক দণ্ড এবং অভ্যন্তরীণ সামরিক বিশ্বাসঘাতকতার ঝুঁকিপূর্ণ সময় চলছিল।
1. সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত ৫১: শত্রুপক্ষ জাতিদের বিরুদ্ধে একটি সতর্কবাণী
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহূদ ও নাসারাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ যালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই আয়াতটি মদিনায় এমন সময়ে অবতীর্ণ হয়েছিল যখন মুসলিম সম্প্রদায় মক্কার পৌত্তলিক (মূর্তি পূজাকারি) কুরাইশদের দ্বারা ক্রমাগত আক্রমণের স্বীকার হচ্ছিল। মদিনার ইহুদি উপজাতিরা প্রাথমিকভাবে মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকলেও তারা গোপনে মক্কার শত্রুদের সাথে ষড়যন্ত্র করছিল এবং তথ্য পাচার করছিল।
এই আয়াতটি ঢালাওভাবে সব যুগের সমস্ত ইহুদি বা খ্রিস্টানদের জন্য নয়। বরং এটি ছিল একটি নিরাপত্তা নির্দেশিকা, যা সেই সময়ের বিশ্বাসঘাতক ও শত্রুর সাথে হাত মেলানো নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর সাথে সামরিক জোট গঠন থেকে মুসলমানদের বিরত রেখেছিল।
2. সূরা আল ‘ইমরান আয়াত ২৮: আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম
মু’মিনগণ যেন মু’মিনগণ ছাড়া কাফিরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করে, মূলতঃ যে এমন করবে আল্লাহর সাথে তার কোন কিছুরই সম্পর্ক নেই, তবে ব্যতিক্রম হল যদি তোমরা তাদের যুলম হতে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর। আর আল্লাহ তাঁর নিজের সম্বন্ধে তোমাদেরকে সাবধান করছেন এবং আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই আয়াতটি মদিনায় হিজরতের পর পরই অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন মুসলমানরা সংখ্যায় এবং রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ছিল। তাদের মধ্যে কিছু মুসলিম তখন ভয়ে তাদের ঈমান লুকিয়ে রাখত এবং শক্তিশালী অমুসলিম নেতাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করত।
এই আয়াতটি এমন একটি কৌশলগত ছাড় দিয়েছিলো, যদি কোনো মুসলিম কোনো নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে, তাহলে তারা বাহ্যিকভাবে অমুসলিমদের সাথে কৌশলগত মিত্রতা প্রদর্শন করতে পারে। মুসলিমদের অন্যদের প্রতি এরকম বিদ্বেষপূর্ণ ও নেতিবাচক স্বভাব ও আচরণ তাদের উপর বিপদ বয়ে আনতে পারে বিধায় এই আয়াতটি আমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছে যে মন দিয়ে না চেলেও বাহ্যিকভাবে আমরা যেন সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখার উত্তম চেষ্টা চালিয়ে যাই।
3. সূরা আল-মুমতাহানা আয়াত ১: একটি নির্দিষ্ট, সক্রিয় শত্রু সনাক্ত করা
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তোমরা তাদের কাছে বন্ধুত্বের খবর পাঠাও, অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে এসেছে তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা রসূলকে আর তোমাদেরকে শুধু এ কারণে বের করে দিয়েছে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহয় বিশ্বাস কর। তোমরা যদি আমার সন্তুষ্টি কামনায় আমার পথে জিহাদে বের হয়ে থাক, তাহলে তোমরা কেন গোপনে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছ? তোমরা যা গোপন কর আর তোমরা যা প্রকাশ কর, তা আমি খুব ভাল করেই জানি। তোমাদের মধ্যে যে তা করে সে সরল পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
নাযিলের প্রেক্ষাপট: যে এই আয়াতটি মক্কা বিজয়ের ঠিক আগে নাজিল হয়েছিল। একজন সাহাবী, হাতিব ইবনে আবি বালতাহ (রা:), ব্যক্তিগত আবেগে মক্কায় তার পরিবারকে নবীর আসন্ন আক্রমণ সম্পর্কে সতর্ক করে একটি গোপন চিঠি পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য বিশ্বাসঘাতকতা পূর্ণ ছিল না; তিনি কেবল তার পরিবারকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। এই আয়াতটি সামরিক বিবেচনায় এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা নিষেধাজ্ঞায় একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা ছিল। এখানে ‘শত্রু’ বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে যারা সরাসরি মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে – এটি সামগ্রিকভাবে অমুসলিম মানুষদেরকে নির্দেশ করে নাজিল হয়নি বরং প্রাথমিক সময়ের মুসলিম সম্প্রদায়ের উপন নির্যাতনা কারীদের সরাসরি উল্লেখ করে এই নির্দেশনাটি দিয়েছিলো। এই আয়াতটি যুদ্ধরত রাষ্ট্রের সাথে সামরিক তথ্য বিনিময় বা গোপন মিত্রতার বিরুদ্ধে একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
বিদ্যানিষ্ঠ ঐকমত্য এবং পরিসমাপ্তি
অতীতকাল থেকে এযাবৎকালের আধুনিক চিন্তাবিদ বিশিষ্ট ইসলামীক উলামা একরাম ও পন্ডিতগণ যেমন শেখ ইউসুফ আল-কারদাওয়ি এবং ডক্টর জামাল বাদাওয়ি, উপরে আলোচিত প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাটিকে ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করে গিয়েছেন। তাদের যুক্তি হলো কুরআন শত্রুভাবাপন্ন অমুসলিম (যাদের সাথে কৌশলগত সামরিক জোট নিষিদ্ধ) এবং শান্তিকামী অমুসলিমদের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখে। মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ও ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখা কেবল অনুমোদিতই নয়, বরং ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচারের (দাওয়াহ) স্বার্থে এটি উৎসাহিতও করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, কুরআনের অন্যান্য আয়াত, যেমন সূরা আল-মুমতাহানাহ (৬০:৮), স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে:
“আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের প্রতি সদয় ও ন্যায়পরায়ণ হতে নিষেধ করেন না, যারা ধর্মের কারণে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কার করেনি।”
উপসংহারে বলা যায়,অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ করার জন্য যে আয়াতগুলো প্রায়ই আলোচিত হয়, সেগুলোকে ঐতিহাসিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কারণে সেগুলো মারাত্মকভাবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা ও অপব্যাখ্যা পায়। এগুলো সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা শত্রুতা বজায় রাখার কোনো চিরস্থায়ী আদেশ নয়। বরং এগুলো হলো সক্রিয় যুদ্ধের সময় প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও নিরএগুলো হলো সক্রিয় যুদ্ধের সময় প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনা, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে এমন গোষ্ঠীগুলোর সাথে কৌশলগত জোট গঠনের বিরুদ্ধে সতর্ক করে। কুরআনের মূল বার্তা হলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সাথে ন্যায়বিচার, দয়া এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখা—যতক্ষণ না তারা সক্রিয় শত্রুতায় লিপ্ত হয়। তাই ব্যক্তিগত বন্ধু এবং রাজনৈতিক মিত্রের মধ্যে এই পার্থক্যটুকু বুঝতে পারাই হলো এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির একটি সঠিক ও সহনশীল সমাধান পাওয়ার চাবিকাঠি।
ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
এই আয়াতগুলোর মধ্যে, আক্ষরিক অনুবাদ এবং গভীর ব্যাখ্যার মাঝে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব এবং কৌশলগত জোটের মধ্যে পার্থক্যটির যে সূক্ষ্ম অস্পষ্টতা রাখা হয়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়, যার পেছনে সম্ভবত একটি ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা কাজ করছে। এটি বিশ্বাসীদের বা মুমিনদের সতর্ক রাখার একটি ঐশ্বরিক ব্যবস্থা হতে পারে। এটি আমাদের অতিরিক্ত পক্ষপাতিত্ব, অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব বা অযৌক্তিক মোহ থেকে রক্ষা করে, যা একজন ব্যক্তিকে অন্ধভাবে অমুসলিমদের অনুসরণ করতে প্ররোচিত করতে পারে এবং তার ঈমান, ইসলামিক মূল্যবোধ বা নৈতিক স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যারা অত্যন্ত আক্ষরিক ও সহজ-ভাষায় এই আয়াতগুলো গ্রহণ করেন, তাদের মতে এই আয়াতগুলো কঠোর ভাবে সকল অমুসলিমদের থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে আদেশ দেয়। যদিও এই ধরনের সতর্কতা সেই সমস্ত সহজ-সরল ব্যক্তিদেরকে ভিন্নধর্মী মাসুন্ডের আবেগপ্রবণ ও অতি নির্ভরশীল অনাকাক্ষিত খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচাতে পারে।
আবার, যারা প্রাসঙ্গিক ও বিশ্লেষণাত্মক অনুধাবন করতে সক্ষম, তারা বুদ্ধিমত্তার সাথে অমুসলিমদের সাথে সুষম সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন। তারা সুনির্দিষ্ট নৈতিক সীমানা বজায় রেখে সম্মানজনক ও ইতিবাচক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। এই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পৃক্ততা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতাই প্রকাশ করে না, বরং এটি নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আদর্শের সাথেও অধিকতর সংগতিপূর্ণ—যে আদর্শ বিশ্বাসীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে না, আবার নিজের আদর্শকেও বিলীন হতে দেয় না। বরং এটি প্রজ্ঞা, আত্মসচেতনতা এবং নৈতিক সংযমের ভিত্তিতে নীতিগত মিথস্ক্রিয়াকে উৎসাহিত করে।