Islam-beliefs

সূরা আস-শামস এর সামঞ্জস্যতা

সূরা আস-শামস এর মাধ্যমে আল্লাহ সুাহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে দেখিয়েছেন যে কিভাবে তিনি আমাদের চোখে দেখা এই পৃথিবীর মধ্যে এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ জগতে ভারসাম্য সৃষ্টি করে রেখেছেন যা আমরা দেখতে না পারলেও একটু চিন্তা করলেই এগুলো ঠিকই অনুধাবন করতে পারি।

এই সূরাটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে:

  1. বাহিরের দৃশ্যমান জগতে সামঞ্জস্যতা: প্রথম অংশে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার কিছু মহান সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, কিভাবে এগুলো একে অপরের বিপরীত হলেও, আল্লাহ্ তাদের উপর কিছু সীমাবদ্ধতা চাপিয়ে রেখে এগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। এটি প্রাথমিকভাবে দৃশ্যমান বিশ্বের সাথে সম্পর্কিত যা আমরা স্বচক্ষে দেখতে পারি।
  2. ভেতরের আধ্যাত্মিক জগতে সামঞ্জস্যতা: দ্বিতীয় অংশে (কেন্দ্রীয় অংশ) আল্লাহ আমাদের ভিতরে নাফস এর ব্যাপারে বলেছেন। বাইরের জগতের মতোই আমাদের ভেতরেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একই ধরণের ভারসাম্য তৈরি করে রেখেছেন।
  3. সামুদ জাতির কাহিনীতে সামঞ্জস্যতা: তৃতীয় অংশে বলা হয়েছে যে কীভাবে মন্দ কাজ করার পূর্বে সামুদ জাতিকে সতর্ক করা হয়েছিল এবং তাদের সীমালঙ্ঘনের কারণে আল্লাহ পুনরায় ভারসাম্য তৈরি করার জন্য তাদেরকে ধ্বংস করেছিলেন।

বাহিরের দৃশ্যমান জগতে সামঞ্জস্যতা

আল্লাহ তায়ালা সর্ব প্রথম সূর্য ও চাঁদ, তারপরে দিন ও রাত এবং তারপর আকাশ ও পৃথিবীর শপথ করে শুরু করেন। এই জিনিসগুলো সাধারণত একে অপরের বিপরীত – তা সত্বেও, এগুলো একে অপরের পরিপূরক হয়ে এই পৃথিবীতে নিজেদের মধ্যে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখেছে।

সূর্য → চাঁদ

দিন → রাত

আসমান [আকাশ] → যমীন [পৃথিবী]

ভেতরের আধ্যাত্মিক জগতে সামঞ্জস্যতা

এগুলি উল্লেখ করার পরেই, আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তাআলা বাহিরের দৃশ্যমান জগৎ থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ জগতে নাফস নামক একটি সত্তার সম্পর্কে উল্লেখ করে বলেছেন যে, তিনি আমাদের বাহিরের জগতের সৃষ্টির মতোই আমদের ভেতরের জগৎটির মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

সাওয়া শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো কোনো কিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বা সামঞ্জস্যতা তৈরি করা। 

পরবর্তী আয়াতেই উল্লেখিত হয়েছে যে, আল্লাহ কীভাবে এই নফসের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে রেখেছেন যখন এটি ফুজুর বা সীমালঙ্ঘনের চেষ্টা করে। ফুজুর শব্দটি চিরে বের হওয়ার সাথে সম্পর্কিত যেমন ফজরের ওয়াক্তে রাতের অন্ধকার চিড়ে সূর্যের আলো বেরিয়ে আসে।

অসৎকর্ম [ফুজুর – সীমালঙ্ঘনের চেষ্টা] → সৎকর্ম [আল্লাহের তাকওয়া]

আমাদের ভিতরের খারাপ চিন্তাগুলোও আমাদেরকে প্রভাবিত করে বেরিয়ে এসে কার্যকর হতে চেষ্টা করে। 

কিন্তু অপর দিকে আল্লাহর তাকওয়া আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রেখে আমাদেরকে সেসব খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। তাকওয়া শব্দটি মানুষের মনে আল্লাহর অস্তিত্বের ও সব বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের উপর দৃঢ় বিশ্বাসকে বুঝায়। আমরা যখন উপলব্ধি করবো যে আল্লাহ্‌ আছেন আর তিনি আমাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছেন তখন আমরা খারাপ কাজ করা থেকে নিজেদেরকে নিজেরাই বিরত রাখব। 

পরবর্তী দুটি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে যে, আমাদের অভ্যন্তরীণ জগৎ ক্রমাগত দূষিত হতে থাকে তাই এটি পরিষ্কার রাখা ও শুদ্ধ করে যাওয়া আমাদের নিজেদেরই দ্বায়িত্ব। এই আয়াতগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সেই ব্যক্তি আসলে সফল যে খারাপ চিন্তাগুলো থেকে নিজের অন্তরকে ক্রমাগত বিশোধিত করতে পারে বা পরিষ্কার রাখতে পারে এবং সেই ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ যে এই কাজটি করতে ব্যর্থ হয়।

পবিত্র করেছে [সফলকাম] → কলূষিত করেছে [ব্যর্থ]

সামুদ জাতির কাহিনীতে সামঞ্জস্যতা

তৃতীয় অংশটি সামুদ জাতির সাথে সম্পর্কিত। আশ্চর্যজনক একটি নিদর্শন রুপে আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই জাতির কাছে একটি উটনি প্রেরণ করা হয়েছিল এবং এক সময়ে এসে তারা বিদ্রোহী হয়ে পড়েছিল সেই উটনিটিকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু, অন্য দিকে তাদের নবী তাদেরকে সতর্ক করে বলেছিলেন, যেন তারা সেই উটনির কোনও রকম ক্ষতি সাধন না করে। 

[বিদ্রোহী সামুদ] মাথা চড়া দিয়ে উঠলো → [সালিহ আঃ সাঃ সতর্ক করেছিল] পানি পান করতে বাধা দিও না

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা তাদের ধ্বংসাত্মক চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তাদের অশুভ পরিকল্পনাকে কার্যকর করে তাদের নবীর বিরুদ্ধে গিয়ে সেই উটনিটিকে হত্যা করে ফেলে। তাদের এই মারাত্মক অপরাধের জন্য তাদের উপর আল্লাহর গজব নাযিল হয়েছিল।

[সামুদ – হত্যা] উটনির পায়ের রগ কেটে দিলো → [আল্লাহ – আযাব] ধ্বংস করে মাটিতে মিশিয়ে দিলেন

যেহেতু অমঙ্গল উর্ধে উঠে গিয়ে গুরুতর ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছিল, তাই আল্লাহ্‌ তা’আলা সেই মন্দের বিরুদ্ধে ফাদামদামা করে তাদেরকে ধংস করে আবার ভারসাম্য তৈরি করেছিলেন।

মানব জাতির চূড়ান্ত সমষ্টিগত সীমালঙ্ঘনের ফলে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কিভাবে পুনরায় সামঞ্জস্যতা জারি করার জন্য তাঁর আজাব নাযিল করে – এই ঘটনাটি তার একটি চমৎকার উদাহারণ।

পরিশেষে, আল্লাহ একটি দারুণ বাক্য উল্লেখ করে এই সূরাটির পরিসমাপ্তি টানেন এই কথা উল্লেখ করে যে, তিনি কোনও পরিণতির ভয় করেন না বা কারো কর্মের পরিণতি দিয়ে কখনই ভয় পান না। সামুদ সম্প্রদায়ের একটি ভুল ধারণা ছিল যে, তারা যদি উটনিটিকে হত্যা করে ফেলে তাহলে, আল্লাহর সেই অলৌকিক ঘটনার নিদর্শন আর অধিকতর মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারবে না, আর এভাবে তারা সফল হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ সুভানু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন যে ভবিষ্যতের প্রত্যেকটি ব্যাপারে তাঁর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি আগে থেকেই জানেন যে ভবিষ্যতে কি ঘটতে চলেছে আর কীভাবে তিনি এসবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবেন, দুনিয়াতে ও আখেরাতে, কারন তিনি হলেন আল-হাকাম – বা চূড়ান্ত ন্যায়বিচারক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.