Islam-beliefs

তাওবাহ করা মানে শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়

ইস্তিগফার ও তাওবাহ এর মধ্যে পার্থক্য

আমাদেরকে প্রথমে ইস্তিগফার এবং তাওবাহ এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।

ইস্তিগফার = পাপ-এর জন্য আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা / মাগফেরাত কামনা।

তাওবাহ = অনুতপ্ত/অনুশোচনা + আফসোস + পাপটিকে ঘৃণা দৃষ্টিতে দেখা + পাপ-টি পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া + অবিলম্বে আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে) অমান্য না করার মনস্থ করা + আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) পথে ফিরে আসা। কোনো মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠিত হলে – ক্ষতিগ্রস্ত/অত্যাচারিত বেক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া অথবা তাদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত। {ইমাম ইবনে উল কাইয়িম আল জাওজিয়াহ এর রচিত মাদারিজ উস-সালিকীন}

সুতরাং, সহজেই বোঝা যায় যে, তাওবাহ করা ইস্তিগফার এর চাইতে অনেক বৃহত্তর কাজ এবং তওবাহ ইস্তিগফারের পরেই ব্যাবহার করা উত্তম। এমনকি পবিত্র কোরআনেও, বিভিন্ন জায়গায় যেখানে দুইটি শব্দেরই ব্যবহার পাওয়া যায়, প্রথমে ইস্তিগফার আসে তারপর তওবাহ এর কথা উল্লেখিত হয়। দুইটি একই জিনিস হলে আলাদা ভাবে উল্লেখিত হতো না।

পবিত্র কুরআন থেকে বিশ্লেষণ: ইস্তিগফার ও তাওবাহ

পবিত্র কুরআনে ইস্তিগফার শব্দটি ২ রকম ভাবে খুঁজে পাওয়া যায়:

  • তাওবাহ ছাড়া ইস্তিগফার
  • তাওবাহ সহ ইস্তিগফার

তাওবাহ ছাড়া ইস্তিগফার

উদাহরণস্বরূপ আয়াতগুলো নিম্নবর্ণিত:

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارً

يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا

অতঃপর বলেছিঃ তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।

তিনি তোমাদের উপর অজস্র বৃষ্টিধারা ছেড়ে দিবেন।

{সূরা নূহ; আয়াত: ১০-১১}

قَالَ يَا قَوْمِ لِمَ تَسْتَعْجِلُونَ بِالسَّيِّئَةِ قَبْلَ الْحَسَنَةِ ۖ لَوْلَا تَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

সালেহ বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা কল্যাণের পূর্বে দ্রুত অকল্যাণ কামনা করছ কেন? তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ না কেন? সম্ভবতঃ তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে।

{সূরা আন নামল; আয়াত ৪৬}

ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

অতঃপর তওয়াফের জন্যে দ্রুতগতিতে সেখান থেকে ফিরে আস, যেখান থেকে সবাই ফিরে। আর আল্লাহর কাছেই মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়।

{সূরা আল-বাকারাহ্; আয়াত: ১৯৯}

وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنتَ فِيهِمْ ۚ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

অথচ আল্লাহ কখনই তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন না যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের উপর আযাব দেবেন না।

{সূরা আল-আনফাল; আয়াত: ৩৩}

তাওবাহ সহ ইস্তিগফার

উদাহরণস্বরূপ আয়াতগুলো নিম্নবর্ণিত:

وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ ۖ وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِيرٍ

আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন…

{সূরা হুদ; আয়াত: ৩}

وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَىٰ قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ

আর হে আমার কওম! তোমাদের পালন কর্তার কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর; তিনি আসমান থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টি ধারা প্রেরণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমরা কিন্তু অপরাধীদের মত বিমুখ হয়ো না।

{সূরা হুদ; আয়াত: ৫২}

وَإِلَىٰ ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا ۚ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ ۚ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ مُّجِيبٌ

আর সামুদ জাতি প্রতি তাদের ভাই সালেহ কে প্রেরণ করি; তিনি বললেন, হে আমার জাতি। আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন উপাস্য নাই। তিনিই যমীন হতে তোমাদেরকে পয়দা করেছেন, তন্মধ্যে তোমাদেরকে বসতি দান করেছেন। অতএব; তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে চল আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন, কবুল করে থাকেন; সন্দেহ নেই।

{সূরা হুদ; আয়াত: ৬১}

ইস্তিগফার ছাড়া তাওবাহ

আবার কিছু আয়াতে ইস্তিগফার ছাড়া তাওবাহ-এর ব্যবহার দেখা যায়। এসব আয়াতে বোঝা যায় যে, তওবাহ-এর মধ্যেই ইস্তিগফার অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ আয়াতগুলো নিম্নবর্ণিত:

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ مِن بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ ۙ أُولَٰئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ

إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَٰئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ ۚ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

নিশ্চয় যারা গোপন করে, আমি যেসব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়েতের কথা নাযিল করেছি মানুষের জন্য কিতাবের মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও; সে সমস্ত লোকের প্রতিই আল্লাহর অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাতকারীগণের।

তবে যারা তওবা করে এবং বর্ণিত তথ্যাদির সংশোধন করে মানুষের কাছে তা বর্ণনা করে দেয়, সে সমস্ত লোকের তওবা আমি কবুল করি এবং আমি তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু।

{সূরা আল-বাকারাহ্; আয়াত: ১৫৯-১৬০}

إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ فَأُولَٰئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا

وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّىٰ إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ ۚ أُولَٰئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا

অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভূলবশতঃ মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে; এরাই হল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ।

আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমন কি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকেঃ আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।

{সূরা আন-নিসা; আয়াত ১৭-১৮}

উপসংহার

তাই, তাওবাহ করা মানে শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়।

তাওবাহ (সংক্ষেপে) = অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) পথে ফিরে আসা এবং গুনাহটি পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া।

একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, আমরা সবসময় আমাদের গুনাহ-গুলো সংগঠনের ব্যপারে অবহিত থাকি না – ইস্তিগফার এসব জিনিসগুলো মাফ করতে সাহায্য করতে পারে। তবে, আমাদের ক্রমাগত নিজেদের পাপ-গুলো নির্ণয় করে এগুলো এড়িয়ে চলার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং ইস্তিগফার ও তাওবাহ – উভয়েরই সাহায্য অবলম্বন করা উচিত।

সুতরাং, যখন দুটি শব্দ ইস্তেগফার ও তাওবাহ একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়:

ইস্তেগফার দ্বারা: আমাদের সাথে অশুভ যাই ঘটে গিয়েছে সেগুলোর ক্ষতি থেকে নিরাপত্তা চাই;

তাওবাহ দ্বারা: আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) পথে ফিরে এসে আমাদের ভবিষ্যতের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা কামনা করি।

সুতরাং, এই দুটির সম্মিলিত ব্যবহার, আমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করতে পারে – এবং আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) সর্বোত্তম সুরক্ষায় অশুভ ক্ষতি থেকে আশ্রয় দিতে পারে।

আসুন আমরা (আমি সহ) ইস্তিগফার ও সত্যিকারের তাওবাহ করে আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) পথে ফিরে আসি, কারণ শয়তান সবসময় আমাদেরকে একই পুরানো কৌশলে বোকা বানায় – আমাদের হৃদয়ে এই কুমন্ত্রণা দিয়ে যে “আরও সময় আছে – আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) পথে পরে ফিরে আসবো – মৃত্যুর ঠিক কাছাকাছি সময়”। একটু বোঝার চেষ্টা করুন যে, পবিত্রতা ও ন্যায়পরায়ণতাই কেবল এই জীবনে আত্মতৃপ্তি ও পরকালের সন্তুষ্টি নিয়ে আসতে পারে – যা অন্য যেকোনো উপায়ে অর্জন করা অসম্ভব যেমন – অর্থ/ধনসম্পদ, মাদকদ্রব্য, অনৈতিক/ব্যভিচারী জীবন অথবা কুরআন ও নামাজহীন একটি জীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.