Islam-beliefs

আদম আঃ এর জীবনী – মানবজাতির সূচনা

আদম আঃ এর জীবনী – মানবজাতির সূচনা

পরাক্রমশালী আল্লাহ়্ তার নতুন সৃষ্টি – মানব সম্পর্কে ফেরেশতাদের অবহিত করেন

মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা ফেরেশতাদিগনকে মাটি নিয়ে আসার আদেশ দিলেন

প্রতিটি মানুষ কেন ভিন্ন (একই পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও)

আদম (আঃ) এর মধ্যে রুহ ফুঁকে দেবার আগে যা ঘটেছিল

মহান আল্লাহ আদম (আঃ) এর রূহ ফুঁকলেন

আল্লাহ আদম (আঃ) কে সকল কিছুর নাম শেখালেন

সর্বশক্তিমান আল্লাহ ফেরেশতাগণ ও ইবলিসকে – আদম (আঃ) এর সামনে সেজদা দিতে আদেশ দিলেন

আদেশটির বিরুদ্ধে ইবলিসের প্রতিক্রিয়া

ইবলিস সেজদা করতে অস্বীকার করে এবং শয়তান-এ রূপান্তরিত হয়

ইবলিস নিজেকে আদম (আঃ) এর সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করেছিল

আল্লাহ তায়ালা ইবলিসকে তার স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন

ইবলিস বেঁচে থাকার এবং মানবজাতিকে বিপথগামী করার অনুমতি চেয়েছিল

যা ঘটেছিল তার জন্য ইবলিস আল্লাহকে দায়ী করেছিল

তাই আল্লাহ তা’আলা এসব প্রতারণা এড়াতে আমাদেরকে বারংবার সতর্ক করেছেন

আল্লাহর সাথে মানবজাতির অঙ্গীকার

নবীদের অঙ্গীকার

আদম (আঃ) এবং ঈসা (আঃ) এর মধ্যে মিল

আদম (আঃ) কে হাওয়া (রাঃ) এর সঙ্গে জান্নাতে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল

নিষিদ্ধ গাছ

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর অবাধ্যতা আমাদের কেবল ক্ষতিই করবে

ব্যাখ্যা: কেন আদম (আঃ) এবং হাওয়া (রাঃ) অবতরণ করলেন

ব্যাখ্যা: আদমের স্বাধীন ইচ্ছা

আদম (আঃ) এবং মুসা (আঃ) এর মধ্যকার বাকবিতণ্ডা – হাদীস

আদম(আঃ) তার আয়ু থেকে দাউদ(আঃ) কে সময় উপহার দিয়েছিলেন

আদম আঃ শুক্রবারে পৃথিবীতে অবতরণ করেছিল

পৃথিবীতে আদম (আঃ) এর জীবনযাপন

পরাক্রমশালী আল্লাহ়্ তার নতুন সৃষ্টি – মানব সম্পর্কে ফেরেশতাদের অবহিত করেন

মহান আল্লাহ্‌ তা’আলা জানালেন যে, তিনি পৃথিবীতে এমন এক প্রতিনিধি প্রেরণ করতে চলেছেন, যার সন্তান-সন্তনি হয়ে বংশবিস্তার করবে। তখন ফেরেশতাগণ সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌কে কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কি সেখানে এমন সম্প্রদয় সৃষ্টি চান যারা পৃথিবীতে ফিৎনা ফ্যাসাদ করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা সর্বদা আপনার প্রশংসা এবং উপাসনায় মগ্ন থাকি।” আল্লাহ্‌ জবাবে বললো, “নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তা তোমরা জান না।” 

আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদিগকে বললেনঃ আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতাগণ বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না।
{সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত ৩০}

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ ঘোষণা দিলেন যে, তিনি কাদামাটি থেকে মানুষ গড়বেন। সেই মাটিকে তিনি আকৃতি দিবেন এবং তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দিবেন।

মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা ফেরেশতাদিগনকে মাটি নিয়ে আসার আদেশ দিলেন 

ইবনে মাস’উদ এবং অন্যান্য সাহাবীগণ হইতে বর্ণিত আছে যে, পরাক্রমশালী আল্লাহ্‌ তা’আলা ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) কে পৃথিবী মাটি এনে দেয়ার জন্য প্রেরণ করলেন। তখন পৃথিবী বললো, “তোমার হাত থেকে আমার পরিমাণ হ্রাস হওয়া কিংবা বিকৃতি হওয়া থেকে আমি মহান আল্লাহ্‌ তা’আলার আশ্রয় প্রার্থণা করছি।” তাই জিবরাঈল (আঃ) সঙ্গে কিছু না নিয়েই ফিরে গিয়ে বললেন: “হে আমার পালনকর্তা,  পৃথিবী আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করেছে।” 

এবার আল্লাহ্‌ তা’আলা ফেরেশতা মিকাঈল (আঃ) কে একই উদ্দেশ্যে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠালেন। এবং একইভাবে পৃথিবী আবারও আল্লাহ্‌র নিকট আশ্রয় প্রার্থণা করলো।  

অতঃপর আল্লাহ্‌ মৃত্যুর ফেরেশতা বা মৃত্যুদূতকে পাঠালে পুনরায় পৃথিবী একইভাবে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থণা করলো। কিন্তু তখন সেই ফেরেশতা বললো: “আমিও তাঁর আদেশ মান্য না করে ফিরে যাবার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করছি।” তাই তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের উপরিভাগ থেকে মাটি নিয়ে, সেগুলো মিশিয়ে তা সঙ্গে নিয়ে আরোহণ করলেন আর আল্লাহ্‌ তা’আলা মাটিগুলোকে ভিজিয়ে আঠালো করলেন।

তারপর আল্লাহ্‌ তা’আলা ফেরেশতাগণকে বললো যে তিনি শুষ্ক ঠনঠনে মাটির কাদা থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে 

…”আমি মাটির মানুষ সৃষ্টি করব।”
{সূরা সাদ: আয়াত ৭১}

…”আমি পচা কর্দম থেকে তৈরী বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্ট একটি মানব জাতির পত্তন করব।”
{সূরা আল-হিজর: আয়াত ২৮}

প্রতিটি মানুষ কেন ভিন্ন (একই পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও) 

আবু মুসা আল-আশয়ারি হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ্‌ আদম (আঃ) কে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার এক মুঠো ধুলোমাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। সেইজন্যই মানবজাতির মধ্যে বিভিন্ন রং; ভালো এবং মন্দ, নরম ও কঠিন, এবং এর মধ্যবর্তীতে যা আসে তার সবকিছুই আছে।” (ইবনে কাথির অনুযায়ী) 

আদম (আঃ) এর মধ্যে রুহ ফুঁকে দেবার আগে যা ঘটেছিল 

ইবনে কাসির রহমতুল্লাহ বলেছেন, সুতরাং আদম (আঃ) কে মানুষের আকারে রূপ দিলেন আল্লাহ্‌ তা’আলা। কিন্তু তিনি তাঁকে অনেক সময় মাটির আকারেই রেখে দিলেন। ফেরেশতারা প্রতিনিয়ত তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলাচল করতো। তার আকৃতি দেখতে ভয়ংকর ছিল। ইবলিস প্রায় সময়ই আদমের আকৃতিটাকে অতিক্রম করতো, আর ওটাতে টোকা মারতো; ফলে মাটির পাত্রে আঘাত করলে যেমন ফাঁপা আওয়াজ হয় তেমন শব্দ হতো। 

আল্লাহ্‌ আমাদের জানিয়েছেন: তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির ন্যায় শুষ্ক মৃত্তিকা থেকে। (সূরা আর-রহমান: আয়াত ১৪) 

আবু হুরাইরা হইতে বর্ণিত আছে যে, মহা নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: অতঃপর আল্লাহ্‌ তাঁকে তেমন অবস্থাতেই রেখে দিলেন যতদিন ধরে সেটা কুমোরের চটচটে মাটিতে পরিণত হয়। ইবলিস প্রায়শই তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলতো ‘তোমাকে একটি মহান উদ্দেশ্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।’ 

মহান আল্লাহ আদম (আঃ) এর রূহ ফুঁকলেন

আল্লাহ সুবহানু ওয়াতালা আমাদেরকে কুরআনে জানিয়েছেন যে, সে আদম আঃ সাঃ এর উপর তার রূহ ফুঁকেছেন। এইখানে আমাদেরকে একটি ব্যাপার অবশ্যই বুঝতে হবে যে, “আমার রূহ” এই শব্দটি দিয়ে আল্লাহ আক্ষরিক অর্থে এই কথা বুঝাননি যে তিঁনি তাঁর নিজের রূহ আদম আঃ সাঃ এর উপর ফুঁকেছেন। তিঁনি এমন শব্দ ব্যবহার করে আসলে বুঝাতে চেয়েছেন যে তাঁর এই সৃষ্টিটি একটি সম্মান জনক সৃষ্টি। সুতরাং, এইখানে এমন কথা বুঝানো হয়নি যে আদম আঃ সাঃ এর ভিতর আল্লাহের ঐশ্বরিক কোনো কিছু বিদ্যমান ছিল যা কিনা আমাদের সবার মধ্যেও আছে. কারণ সকল জীবিত মানুষের মধ্যেই তার রূহ থাকে।

যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তাতে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সম্মুখে সেজদায় নত হয়ে যেয়ো। {সূরা সাদ: আয়াত ৭২; সূরা আল-হিজর: আয়াত ২৯}

আল্লাহ তা’আলা তাদের মতামত জিজ্ঞাসার্থে কিংবা তাদের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করার জন্যে এমনটা করেননি; কেননা তিনি এসকল কিছুর উর্ধ্বে। তিনি কেবল তাদেরকে আদেশ করেছিলেন যেন তারা তা মান্য করে। উল্লেখ্য যে, ঐ সেজদা শ্রদ্ধা স্বরূপ করতে বলা হয়েছিল (ইবাদতের উপলক্ষ্যে নয়)। ইবাদতের সেজদা একমাত্র আল্লাহর জন্যই করা হয়ে থাকে। 

ইবনে কাসির রহমতুল্লাহ বলেছেন, রুহটি শরীরের উপর মাথা থেকে নিচে পা পর্যন্ত যেতে থাকে। যখন রূহ চোখ পর্যন্ত পৌছুলো তখন সে দেখতে পেল সব ফেরেস্তারা তাকে সেজদা করছে একজন (ইবলিস) ব্যতীত। নাক পর্যন্ত পৌছুলে সে হাঁচি দিয়েছিল, আর মুখ পর্যন্ত পৌঁছুতেই আদম (আঃ) বলেছিলেন আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা ও ধন্যবাদ আল্লাহর জন্য) উত্তরে আল্লাহ্‌ বলেছিলেন: ইয়ারহামুকাল্লাহ (তোমার পালনকর্তার দয়া তোমার উপর বর্ষিত হোক) {জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৩৬৮}। এটাই ছিল আল্লাহ ও মানব জাতির প্রথম কথোপকথন। তারপর, রূহ তার পেট পর্যন্ত পৌঁছুলে তার খিদা পেল আর সে জান্নাতের ফল দেখে সেগুলো খাওার জন্য আগ বাড়াতে চেয়েও পারলেন না কারন তার পা পর্যন্ত তখনও রূহ পৌঁছায়নি। অনেক উলামাদের মতে আল্লাহ এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুরআনে বলেছেনঃ সৃষ্টিগত ভাবে মানুষ ত্বরাপ্রবণ... {সূরা আম্বিয়া আয়াত ৩৭}

আল্লাহ আদম (আঃ) কে সকল কিছুর নাম শেখালেন 

আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সবকিছুর নাম শিখিয়ে দিলেন। সব মানুষ এবং সব বস্তুর নাম তার জানা আছে। তারপর আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে কিছু জিনিসের নাম জিজ্ঞেস করলেন, তারা উত্তরে বলল আল্লাহ আপনি সর্ব জ্ঞানী, আমরা তো শুধু ততটুকই জানি যা আপনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন। তারপর, আল্লাহ আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেইসব জিনিসের নাম জিজ্ঞেস করলে, সে ফেরেস্তাদের সামনে সেগুলোর নামগুলো বলে দিল। এইভাবে, আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে দেখিয়ে দিলেন যে তিনি আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন জ্ঞান দিয়েছিলেন যা তিনি ফেরেশতাদেরকেও দেন নি।

তারপর আল্লাহ তাআলা বললেন, যে তিনি জানেন কে কি প্রকাশ করে, আর কি কি গোপন করে – কোনো কিছুই তার জ্ঞানের আওতাধীন নয়। এইখানে একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল যে, তখন সেখানে ফেরেশতা এবং আদম আলাইহিস সালাম উপস্থিত ছিল আর তাদের মধ্যে গোপন করার কিছুই ছিল না। একমাত্র ইবলিসই সেইখানে উপস্থিত ছিল, যে তার মনের মধ্যে প্রচন্ড পরিমানে হিংসা ও অহংকার গোপন করে রেখেছিল, যা ঠিক পরের আয়াতগুলিতে স্পষ্ট হয়ে উঠে।

আর আল্লাহ তা’আলা শিখালেন আদমকে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম। তারপর সে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।
তারা বলল, তুমি পবিত্র! আমরা কোন কিছুই জানি না, তবে তুমি যা আমাদিগকে শিখিয়েছ (সেগুলো ব্যতীত) নিশ্চয় তুমিই প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন, হেকমতওয়ালা।
তিনি বললেন, হে আদম, ফেরেশতাদেরকে বলে দাও এসবের নাম। তারপর যখন তিনি বলে দিলেন সে সবের নাম, তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আসমান ও যমীনের যাবতীয় গোপন বিষয় সম্পর্কে খুব ভাল করেই অবগত রয়েছি? এবং সেসব বিষয়ও জানি যা তোমরা প্রকাশ কর, আর যা তোমরা গোপন কর! {সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩১-৩৩}

সুতরাং, ফেরেশতাগণ বুঝতে পারলো যে, আদম (আঃ) এমন এক সৃষ্টি যে অনেককিছুই জানে যা তারা নিজেরাও জানে না।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ ফেরেশতাগণ ও ইবলিসকে – আদম (আঃ) এর সামনে সেজদা দিতে আদেশ দিলেন

সেই সময়টাতে ইবলিস(জ্বিন)-কে তার ফেরেশতাদের সাথে অবস্থান করে আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। 

এরপর সময় আসলো যখন আল্লাহ্‌ ফেরেস্তাদের নির্দেশ দিলেন (তাদের মধে ইবলিসও উপস্থিত ছিল) আমি যখন রূহ ফুঁকব তখন তোমরা আদম আঃ কে সম্মানজনক সেজদা করবে। 

আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরপর আকার-অবয়ব, তৈরী করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলছি, “আদমকে সেজদা কর”… {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১১}

আদেশটির বিরুদ্ধে ইবলিসের প্রতিক্রিয়া 

ইবলিস সেজদা করতে অস্বীকার করে এবং শয়তান-এ রূপান্তরিত হয়

ইবলিস অহংকারের কারণে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং একজন কাফের (শয়তান) হয়ে যায়: 

এবং যখন আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজদা করলো। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করলো। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।
{সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩৪; সূরা সাদ: আয়াত ৭৩-৭৪}
তখন ফেরেশতারা সবাই মিলে সেজদা করলো। কিন্তু ইবলীস-সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হতে স্বীকৃত হলো না। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩০-৩১; সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১১}

ইবলিস নিজেকে আদম (আঃ) এর সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করেছিল 

আল্লাহ তা’আলা যখন ইবলিসকে আদেশ অস্বীকার করার যথাযথ কারণ উল্লেখ করতে বললেন তখন ইবলিস নিজেকে আদম (আঃ) এর সঙ্গে তুলনা করে তার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে বলেছিল “আমি আদমের চাইতে শ্রেষ্ট। আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দিয়ে।” ইবলিসের বিশ্বাস ছিল যে, সৃষ্টি জগতে সে আদম (আঃ) এর চাইতেও উন্নত এবং অধিক সম্মানের অধিকারী একটি সৃষ্টি। সেইজন্য, আল্লাহর আদেশ করা সত্ত্বেও ইবলীস সেজদায় যেতে অস্বীকার করেছিল। আসলে, তার মনের মধ্যে খারাপ প্রকৃতির হিংসা জন্মেছিল।

ইবলিসের আদম (আঃ) এর প্রতি ঈর্ষা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে উঠে এসেছে:

আল্লাহ বললেনঃ আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সেজদা করতে বারণ করল? সে বললঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ট। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা।
{সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১২; সূরা সাদ: আয়াত ৭৬}
আল্লাহ বললেনঃ হে ইবলিস, তোমার কি হলো যে তুমি সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হতে স্বীকৃত হলে না? বললঃ আমি এমন নই যে, একজন মানবকে সেজদা করব, যাকে আপনি পচা কর্দম থেকে তৈরী ঠনঠনে বিশুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩২-৩৩}
…বললঃ আমি এমন নই যে, একজন মানবকে সেজদা করব, যাকে আপনি পচা কর্দম থেকে তৈরী ঠনঠনে বিশুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। {সূরা আল-ইসরা: আয়াত ৬১}

আল্লাহ তায়ালা ইবলিসকে তার স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন 

অস্বীকারের কারণে, ইবলিসকে বহিষ্কার করে দেয়া হয়েছিল: 

বললেন তুই এখান থেকে যা। এখানে অহংকার করার কোন অধিকার তোর নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভুক্ত। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৩}
আল্লাহ বললেনঃ বের হয়ে যা, এখান থেকে। কারণ, তুই অভিশপ্ত। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩৪; সূরা সাদ: আয়াত ৭৭}

ইবলিস বেঁচে থাকার এবং মানবজাতিকে বিপথগামী করার অনুমতি চেয়েছিল 

ইবলিস তখন কিয়ামত পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ তা’আলার কাছে অনুরোধ করে। তাকে কেয়ামতের আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকার অনুমতি দেয়া হয়। তিনি তার অস্বীকারকে ন্যায্যতার বন্ধনে বাঁধার চেষ্টায় বলেছিল যে, কাদামাটি থেকে সৃষ্ট এই নতুন সৃষ্টি (যাকে ইবলিসের চাইতেও সম্মানিত করা হয়েছে) – তার পক্ষে এই মানুষকে খুব সহজেই বিভ্রান্ত এবং বিপথগামী করা সম্ভব। 

ইবলিসের এই চ্যালেঞ্জটিকে সর্বদা আমাদের মাথায় রাখতে হবে:

সে বললঃ দেখুন তো, এনা সে ব্যক্তি, যাকে আপনি আমার চাইতেও উচ্চ মার্যাদা দিয়ে দিয়েছেন। যদি আপনি আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত সময় দেন, তবে আমি সামান্য সংখ্যক ছাড়া তার বংশধরদেরকে সমূলে নষ্ট করে দেব। {সূরা আল-ইসরা: আয়াত ৬২}
সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন।
আল্লাহ বললেনঃ তোমাকে অবকাশ দেয়া হল। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩৬-৩৭; সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৪-১৫; সূরা সাদ: ৭৯-৮০}

যা ঘটেছিল তার জন্য ইবলিস আল্লাহকে দায়ী করেছিল

ইবলিসের যুক্তি ছিল যে আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। সে তার নিজের অবাধ্যতার দোষ স্বীকার না করে উল্টো আল্লাহ সুভানাহু ওয়া তালা কেই দায়ী করে বললো যে, সে পৃথিবীর বিভিন্ন সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করে মানব জাতীকে পথভ্রষ্ট করবে। সে প্রতিজ্ঞা করলো যে, মানবজাতিকে সে বিপথগামী করে তার সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।

সে বললঃ হে আমার পলনকর্তা, আপনি যেমন আমাকে পথ ভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথ ভ্রষ্ঠ করে দেব। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩৯}

শয়তান মানুষদের এমন কুবুদ্ধি দেয়, যার জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা তাদের কাছে আকর্ষণীয় লাগে। এবং সে যখন-তখন, সামনে-পিছনে, ডানে-বামে থেকে, যে কোনো ভাবেই আমাদেরকে আক্রমণ করতে পারে; শয়তান আমাদের অধিকাংশ মানুষকে প্রভাবিত করে আল্লাহর প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বার্থ করে দেয়। 

সে বললঃ আপনি আমাকে যেমন উদভ্রান্ত করেছেন, আমিও অবশ্য তাদের জন্যে আপনার সরল পথে বসে থাকবো। এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৬-১৭}

তাই আল্লাহ তা’আলা এসব প্রতারণা এড়াতে আমাদেরকে বারংবার সতর্ক করেছেন 

আমাদের চির-শত্রু, শয়তানের দ্বারা যেন আমরা প্রতারিত না হই সেইজন্য আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনে বহুবার সতর্ক করে দিয়েছেন যেনো আমরা শয়তানের উপস্থিতি উপলব্ধি করে তাকে আমাদের সত্যিকারের শত্রু হিসেবে নেই: 

হে বনী-আদম শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে (আদম এবং হাওয়া) জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ২৭}
শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তাকে শত্রু রূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে আহবান করে যেন তারা জাহান্নামী হয়। {সূরা ফাতির: আয়াত ৬}

আল্লাহর সাথে মানবজাতির অঙ্গীকার

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তালা একবার আদম (আঃ) এর পেছন বুলিয়ে সেখান থেকে তার বংশধরদের রূহ/আত্মা বের করে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “আমি কি তোমাদের রব নই?” তাদের মধ্যে আমরা সহ, এই পৃথিবীতে এই পর্যন্ত যত মানুষ এসেছে এবং আসবে সবার রূহ উপস্থিত ছিল। 

তখন, আমরা আল্লাহকেই আমাদের রব/ঈশ্বর বলে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলামঃ “অবশ্যই, আমরা অঙ্গিকার করে বলছি যে আপনি আমাদের পালনকর্তা।”

আমাদের সাক্ষ্য দেয়ার পর আল্লাহ তা’আলা বলেছিলেন, “আশা করি পুনরুত্থানের দিনেও তোমরা এই একই সাক্ষ্য দিতে পারবে।” কিন্তু এই ঘটনাটি আমরা ভূলে গিয়েছি।

তারপর আল্লাহ সুবহানু ওয়াতালা বলেছিল যে, যদি আমরা সক্ষম না হই, তাহলে আমরা যেন নিজের অজ্ঞতা বা নিজেদের বাপ-দাদার প্রথা অনুসরণ করাকে অজুহাত হিসেবে  না পেশ করি – কারণ, আল্লাহ আমাদের কুরআনের সাহায্যে পথনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন।

আর যখন তোমার পালনকর্তা বনী আদমের পৃষ্টদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের উপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। আবার না কেয়ামতের দিন বলতে শুরু কর যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। অথবা বলতে শুরু কর যে, অংশীদারিত্বের প্রথা তো আমাদের বাপ-দাদারা উদ্ভাবন করেছিল আমাদের পূর্বেই। আর আমরা হলাম তাদের পশ্চাৎবর্তী সন্তান-সন্ততি। তাহলে কি সে কর্মের জন্য আমাদেরকে ধ্বংস করবেন, যা পথভ্রষ্টরা করেছে? বস্তুতঃ এভাবে আমি বিষয়সমূহ সবিস্তারে বর্ণনা করি, যাতে তারা ফিরে আসে। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৭২-৪}

যদিও এই পুরো ঘটনাটি আমরা ভুলে গিয়েছি – কিন্তু আমাদের ভিতর ফিত্রাহ নামে একটি জিনিস আছে যে জানে যে আল্লাহ আমাদের একমাত্র রব।

…এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যে প্রকৃতি (ফিতরাহ) তিনি মানুষকে দিয়েছেন, আল্লাহর সৃষ্টি কার্যে কোন পরিবর্তন নেই, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। {সূরা আর-রূম: আয়াত ৩০}

ইবনে কাসির রহমতুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ আদমকে উত্থাপন করে এবং সে সমগ্র মানব জাতীকে দেখতে পায়: তিনি তাদের মধ্যে ধনী-গরীব, সুগঠিত-দুর্বল, ভালো অবস্থা ও খারাপ অবস্থার মানুষ দেখতে পেলো। তারপর আদম (আঃ) বললেন: “হে আল্লাহ! আমি চাই আপনার সকল বান্দারা সমান হোক।” জবাবে আল্লাহ বললেন, “আমি প্রশংসা পছন্দ করি।”  আদম (আঃ) মানবজাতির মধ্যে নবীগণকে আলোকিত প্রদীপের মত দেখতে পেলেন। 

নবীদের অঙ্গীকার

সর্বশক্তিমান আল্লাহ প্রত্যেকটি নবীদের কাছ থেকেও ধর্ম বাস্তবায়ন ও প্রচার করার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন বিশেষ করে মুহাম্মদ সা, নূহ, ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসা আ সা এর কাছে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন।

যখন আমি পয়গম্বরগণের কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে এবং নূহ, ইব্রাহীম, মূসা ও মরিয়ম তনয় ঈসার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম এবং অঙ্গীকার নিলাম তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার। {সূরা আল-আহযাব: আয়াত ৭}

আদম (আঃ) এবং ঈসা (আঃ) এর মধ্যে মিল

সর্বশক্তিমান আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে ঈসা (আঃ সাঃ) আর আদম (আঃ সাঃ) দেখতে একই রকম ছিলেন।

নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মতো। তাকে মাটি দিয়ে তৈরী করেছিলেন এবং তারপর তাকে বলেছিলেন হয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেন। {সূরা আল-ইমরান: আয়াত ৫৯}

আদম (আঃ) কে হাওয়া (রাঃ) এর সঙ্গে জান্নাতে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল

মহান আল্লাহ তা’আলা আদম আঃ সাঃ থেকে হাওয়া রাঃ কে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ জানিয়েছেন যে তিঁনি হাওয়া রাঃ কে সৃষ্টি করেছেন যেন আদম আঃ তার সাথে থেকে সস্থি পায়।

তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র সত্তা থেকে; আর তার থেকেই তৈরী করেছেন তার জোড়া, যাতে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৮৯}

ইবনে কাসীর রহমতুল্লাহ বলেছেন, আদম (আঃ) স্বর্গেই থাকতেন, একাকীত্ব বোধ করতেন এবং তার এমন কোনো সঙ্গীও ছিল না যার কাছ থেকে তিনি খানিকটা প্রশান্তি পেতে পারেন। একদিন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম থেকে উঠে মাথার কাছে কাউকে বসে থাকতে দেখলেন তিনি। এক সুন্দরী রমণী; স্নিগ্ধ আর কোমল দৃষ্টি মেলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

আদম (আঃ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে?”  উত্তরে সে বললো, “আমি একজন নারী।”  তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে?”  জবাবে, “যাতে আমার মধ্যে তুমি প্রশান্তি খুঁজে পাও।”

ফেরেশতারা আদম (আঃ) এর কাছে তার নাম জানতে চাইলে জবাবে তিনি বললেন, হাওয়া (ইংরেজিতে Eve) – যার মানে জীবিত কিছু। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কেন তাকে হাওয়া নামে ডাকছেন?” জবাবে আদম (আঃ) বললেন, “কারণ সে আমার থেকে সৃষ্টি হয়েছে আর আমি একজন জীবিত সত্তা।”

এবং আমি আদমকে হুকুম করলাম যে, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং ওখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তিসহ খেতে থাক… {সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩৫}

আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা নারীদেরকে উত্তম নাসীহাত প্রদান করবে। কেননা নারী জাতিকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে উপরের হাড়টি বেশী বাঁকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে আর যদি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাঁকাই থাকবে। কাজেই নারীদেরকে নাসীহাত করতে থাক।” {সহীহ বুখারী বই ৬০, হাদিস ৬/ ৩৩৩১}

নিষিদ্ধ গাছ

আদম (আঃ) এবং হাওয়া (রাঃ) কে জান্নাতে বসবাস করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেখানে তারা সকল মানব জাতির প্রত্যাশিত জায়গায় জীবন যাপন করছিলো। তবে, আল্লাহ তা’আলা তাদের দুজনকে সেখানের সবকিছু উপভোগ করার অনুমতি দিয়েছিল শুধুমাত্র একটি গাছ ব্যতীত। আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলা তাদেরকে সেই গাছটির নিকটবর্তী হতেও সতর্কসরুপ নিষেধ করেছিল।

…“কিন্তু এ গাছের নিকটবর্তী হয়ো না। অন্যথায় তোমরা যালিমদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়বে।”  {সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩৫; সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৯}

আদম (আঃ) এবং হাওয়া   দুর্বল হয়ে থাকে। একটি মানুষের মধ্যে কিছুটা ভুলে যাবার প্রবণতাও থাকে, হৃদয়ে পরিবর্তন আসে আর দৃঢ়তা বাড়ে ও কমে। ইবলিস প্রচণ্ড ঈর্ষার মধ্যে নিমজ্জিত থেকে আদম আ সা কে তার মানব দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে বিভ্রান্ত করতে থাকে। সে প্রতিদিন তার মনে ফিসফিস করে প্ররোচণা দিতে থাকে, “আমি কি তোমাকে অমরত্বের পথনির্দশনা দিবো? যাতে তুমি চিরন্তন এই রাজ্যে বসবাস করে এর সবকিছু উপভোগ করতে পারো।  আমি কি তোমাদের সেই গাছটার কাছে নিয়ে যাবো?”  সে আরো বলে গেলো “তোমাদের পালনকর্তা তোমাদেরকে এই জন্যই এই ফল খেতে নিষেধ করেছে যেন তোমরা চিরস্থায়ী ফেরেশতা না হয়ে যাও। ইবলিস তাদেরকে ভরসা দিয়ে বলল যে আমি তোমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী।

সে বললঃ তোমাদের পালনকর্তা তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেননি; তবে তা এ কারণে যে, তোমরা না আবার ফেরেশতা হয়ে যাও-কিংবা হয়ে যাও চিরকাল বসবাসকারী। সে তাদের কাছে কসম খেয়ে বললঃ আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাঙ্খী। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ২০-২১}

আদম (আঃ) নিজেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করতো, “কি হবে যদি এই গাছের ফল খাই আমি? এমনও তো হতে পারে যে এইটাই অমরত্বের বৃক্ষ।” তার স্বপ্ন ছিল বেহেশতের নিখাদ পবিত্রতায় অনন্তকাল বেঁচে থাকার।

ইবলিস একটি লম্বা সময় ধরে তাদেরকে বোঝাতে থাকলো এবং শেষ পর্যন্ত, একদিন তারা সিদ্ধান্ত নিলো যে, সেই গাছের ফল খাবে। ইবলিস যে তাদের পরম শত্রু যে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছে, তারা দুজনেই তা ভুলে গিয়েছিল। আদম আঃ সাঃ হয়তো একথাও ভুলে গিয়েছিলো যে তিনি আল্লাহের কাসে শপথ নিয়েছিলেন যে সে গাছটি থেকে খাবেন না।

আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি। {সূরা ত্বোহা: আয়াত ১১৫}

আল্লাহ সুবহানাতায়ালার নিষেধাজ্ঞা সত্বেও আদম (আঃ) গাছটির নিকটবর্তী হলো এবং তারা দুজনেই সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেল। 

আল্লাহ আমাদের বলেন, “অতঃপর প্রতারণাপূর্বক তাদেরকে সম্মত করে ফেলল।” {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ২২}
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেন, “আদম তার পালনকর্তার অবাধ্যতা করল, ফলে সে পথ ভ্রষ্ঠ হয়ে গেল।” {সূরা ত্বোহা: আয়াত ১২১}

আদম (আঃ) এর খাওয়ার পর, তিনি আবিষ্কার করলেন যে, তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনেই বিবস্ত্র। তাই, তারা লজ্জা নিবারণ করতে আশেপাশের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে ঢাকতে শুরু করলো। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনে এসব কথা জানিয়েছেন।

হে বনী-আদম শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এমতাবস্থায় যে, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছি-যাতে তাদেরকে লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে এবং তার দলবল তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখ না। আমি শয়তানদেরকে তাদের বন্ধু করে দিয়েছি, , যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ২৭}

মহান আল্লাহ তা’আলা আদম (আঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে খেতে নিষেধ করিনি এবং বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। তারা উভয়ে বললঃ হে আমাদের পালনকর্তা আমরা নিজেদের প্রতি জুলম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব। আল্লাহ বললেনঃ তোমরা পৃথিবীতে নেমে গিয়ে সেখানে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বসোবাস করে মৃত্যুবরন করবে এবং সেখান থেকেই  পুনরুত্থিত হবে।

আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি এবং বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। তারা উভয়ে বললঃ হে আমাদের পালনকর্তা আমরা নিজেদের প্রতি জুলম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব। আল্লাহ বললেনঃ তোমরা নেমে যাও। তোমরা এক অপরের শত্রু। তোমাদের জন্যে পৃথিবীতে বাসস্থান আছে এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ফল ভোগ আছে। বললেনঃ তোমরা সেখানেই জীবিত থাকবে, সেখানেই মৃত্যুবরন করবে এবং সেখান থেকেই  পুনরুত্থিত হবে। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ২২-২৫} 

তারা জান্নাত ত্যাগ করলো এবং পৃথিবীতে অবতরণ করলো। তারা দুইজন অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন। আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করলেন।

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর অবাধ্যতা আমাদের কেবল ক্ষতিই করবে

আদম (আঃ) কে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল যে, শয়তান হচ্ছে তার একমাত্র শত্রু। কিন্তু সে এই কথা ভুলে গিয়েছিল, তাই শয়তান তাকে সহজেই ধোঁকা দিয়ে মহান আল্লাহর অবাধ্যতা করাতে সক্ষম হয়েছিল। তবে, পরবর্তীতে তওবা করার জন্য তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়; এবং আল্লাহ তা’আলা পুনরায় তাকে পথনির্দেশনা দেন।

আদম (আঃ) ও তার স্ত্রীকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়। তাকে অবহিত করা হয় যে, তার বংশধরের কেউ যদি আল্লাহর নির্দেশনা গ্রহণ ও মান্য করে; তবে সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। কিন্তু যে অবজ্ঞা করবে, তাকে অসুখী জীবন পার করতে হবে এবং কেয়ামতের দিন তাকে অন্ধ করে পুনরুত্থান করা হবে কারণ দুনিয়াতে আল্লাহর আয়াতসমূহ এর ব্যাপারে তারাও অন্ধ বা বেখেয়াল ছিল।

মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলের জন্য এই শিক্ষামূলক সতর্কীকরণ বাণী দিয়েছেন: 

আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি। যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললামঃ তোমরা আদমকে সেজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সেজদা করল। সে অমান্য করল। অতঃপর আমি বললামঃ হে আদম, এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু, সুতরাং সে যেন বের করে না দেয় তোমাদের জান্নাত থেকে। তাহলে তোমরা কষ্টে পতিত হবে। তোমাকে এই দেয়া হল যে, তুমি এতে ক্ষুধার্ত হবে না এবং বস্ত্রহীণ হবে না। এবং তোমার পিপাসাও হবে না এবং রৌদ্রেও কষ্ট পাবে না। অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রনা দিল, বললঃ হে আদম, আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্তকাল জীবিত থাকার বৃক্ষের কথা এবং অবিনশ্বর রাজত্বের কথা? অতঃপর তারা উভয়েই এর ফল ভক্ষণ করল, তখন তাদের সামনে তাদের লজ্জাস্থান খুলে গেল এবং তারা জান্নাতের বৃক্ষ-পত্র দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করতে শুরু করল। আদম তার পালনকর্তার অবাধ্যতা করল, ফলে সে পথ ভ্রষ্ঠ হয়ে গেল। এরপর তার পালনকর্তা তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি মনোযোগী হলেন এবং তাকে সুপথে আনয়ন করলেন। তিনি বললেনঃ তোমরা উভয়েই এখান থেকে এক সঙ্গে নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়েত আসে, তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ঠ হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুমান ছিলাম। আল্লাহ বলবেনঃ এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব। এমনিভাবে আমি তাকে প্রতিফল দেব, যে সীমালঙ্ঘন করে এবং পালনকর্তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন না করে। তার পরকালের শাস্তি কঠোরতর এবং অনেক স্থায়ী। {সূরা ত্বোহা: আয়াত ১১৫-১২৭}

ব্যাখ্যা: কেন আদম (আঃ) এবং হাওয়া (রাঃ) অবতরণ করলেন 

কিছু লোক এই কথা বিশ্বাস করে যে, মানবজাতি জান্নাতেই বসবাস করতো, আদম (আঃ) এর অবাধ্যতার কারণেই আজ আমরা পৃথিবীতে। তা নাহলে আমরা হয়তো চিরকাল জান্নাতেই বসবাস করার সুযোগ পেতাম। এগুলি নিছক কল্প কাহিনী ও ভূল ধারণা, কারণ আদম আঃ সাঃ কে সৃষ্টি করার আগেই আল্লাহ ফেরেশতাগণকে বলেছিলেন যে, “আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরণ করতে যাচ্ছি।” তিনি একথা বলেননি যে, “আমি জান্নাতে প্রতিনিধি বানাতে চাই।” 

আল্লাহ জানতেন যে, আদম (আঃ) এবং হাওয়া (রাঃ) সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খাবে এবং পৃথিবীতে অবতরণ করবে। তিনি একথাও জানতেন যে, শয়তান তাদের সরলতার ফায়দা নেবে। এই সম্পূর্ণ ঘটনাটি আদম (আ), হাওয়া (রা) এবং তার বংশধরদের জন্য (যাদের মধ্যে আমরাও অন্তর্ভুক্ত) একরকমের শিক্ষণীয় ব্যাপার যে কিভাবে শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করে জান্নাত থেকে বিতাড়িত করেছে। আমরা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করলেই নিজেদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারব আর জান্নাতে পৌঁছুতে পারবো ইনশা আল্লাহ্।  

ব্যাখ্যা: আদমের স্বাধীন ইচ্ছা 

এমন কথা কি বলা উচিত যে, আদম (আঃ) এর অবাধ্যতা; জান্নাত থেকে বিতাড়িত হওয়া এবং পৃথিবীতে অবতরণ করা, এই পুরো ব্যাপারটাই পূর্ব-পরিকল্পিত? 

আল্লাহ কোনো কিছুকেই জোর করে বাধ্য করে ঘটায়নি। তিনি মানব জাতিকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন।  আদম (আঃ) এরও পূর্ণ ইচ্ছাশক্তি ছিল বিধায় সে নিজের অবাধ্যতার দায়ভার নিজেই স্বীকার করেছিলেন। 

তাই আদম (আঃ) অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে তওবা করেছিলেন যা আল্লাহ সুবহানু ওয়াতালা কবুল করেছিলেন। আদম (আঃ) এর এই ঘটনাটি কুরআনে বহুবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যেন আমরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহন করতে পারি যে, শয়তান কীভাবে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে আর আমরা কিভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পারি এবং আমাদের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি।

আদম (আঃ) এবং মুসা (আঃ) এর মধ্যকার বাকবিতণ্ডা – হাদীস 

একবার আল্লাহ (সুবহানু ওয়াতালা) মূসা (আঃ) কে আদম (আঃ) এর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন যেখানে তিনি আদম(আঃ) সাথে তর্ক করে বলেছিলেন যে, তার সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার কারণেই আমরা(গোটা মানবজাতি) সকলে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছি। কিন্তু আদম (আঃ) সুন্দরভাবে পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আসলে আদমের সৃষ্টিরও অনেক আগে থেকেই এই ব্যাপারটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। আদম (আঃ) এর এই যুক্তির কাছে মূসা (আঃ) পরাস্ত হয়েছিলেন। এখনও আমাদের অনেকের মনেও এই একই প্রশ্ন থেকে গিয়েছে আর এইখানেই এর উত্তর রয়েছে: আদম (আঃ) আসলে তার পাপের জন্য আল্লাহ তা’আলাকে দোষ দেননি। বরং তিনি তার যুক্তিতে এটাই বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি সহ সমগ্র মানবজাতির পৃথিবীতে আসার ব্যাপারটা পূর্বনির্ধারিত ছিল। সুতরাং এই পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব ও বসবাস আদম (আঃ) এর পাপের কারণে নয় বরং তা সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত ছিল। 

আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত আছে যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, আদম (আঃ) ও মূসা (আঃ) তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। তখন মূসা (আঃ) তাঁকে বলছিলেন, আপনি সেই আদম যে আপনার ভুল আপনাকে বেহেশত হতে বের করে দিয়েছিল। আদম (আঃ) তাঁকে বললেন, আপনি কি সেই মূসা যে, আপনাকে আল্লাহ্‌ তাঁর রিসালাত দান এবং বাক্যালাপ দ্বারা সম্মানিত করেছিলেন। অতঃপরও আপনি আমাকে এমন বিষয়ে দোষী করছেন, যা আমার সৃষ্টির আগেই আমার জন্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’বার বলেছেন, এ বিতর্কে আদম (আঃ) মূসা (আঃ)–এর ওপর বিজয়ী হন। {সহীহ বুখারী বই ৬০, হাদিস ৮২/ ৩৪০৯}

এখানে একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণীয় বিষয় হলো:

  • যখন মূসা (আঃ) এই পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্বের পরিণতি হিসাবে আদম (আঃ) কে দোষারোপ করেছিলেন, আদম (আঃ) যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন যে, এই ব্যাপারটি পূর্বনির্ধারিত ছিল।
  • কিন্তু, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যখন আদম (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন তিনি সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছেন, তখন তিনি তার নিজের দোষ স্বীকার করে অনুশোচনার সাথে তওবা করেছিলেন।

আসলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি নিজেই সেই ভুলটি করেছেন এবং তার দ্বায়ভার নিজের উপরেই নিয়েছিলেন। সুতরাং, পুনঃ নির্ধারণ ও নিজের পাপের জন্য দায়ভার গ্রহণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহ (সুবহানু ওয়াতালা) জানেন যে কে ভুল করতে চলেছে তবে তিনি কখনই সেই ব্যক্তিকে ভুল করতে বাধ্য করেন না।

আদম(আঃ) তার আয়ু থেকে দাউদ(আঃ) কে সময় উপহার দিয়েছিলেন

আদম (আঃ) তার জীবনের দীর্ঘতম মেয়াদ থেকে ৬০ বছর দাউদ (আঃ) কে উপহার দিয়েছিলেন এবং নিজের মৃত্যুর সময় তিনি এই কথাটি ভুলেও গিয়েছিলেন। আদম (আঃ) এর সামনে যখন আল্লাহ সুবহানু ওয়াতালা মানবজাতির রূহ উপস্থাপন করেছিলেন তখন আদম (আঃ) তাদের মধ্যে অতিউজ্জ্বল দাউদ (আঃ) এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, আল্লাহ তাকে জানিয়ে দেন যে তার জীবনধারণের জন্য চল্লিশ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। আদম (আঃ) তার নিজের আয়ু থেকে ৬০ বছর দাউদ (আঃ) কে দিয়ে দিতে বলেছিলেন। পরবর্তীতে আদম (আঃ) এর পৃথিবীতে থাকাকালীন সময়ে যখন তার মৃত্যুর সময় এসে গিয়েছিলো আর মালাকুল মাউত তার যান কবজ করার অনুমতি চেয়েছিলেন তখন সে বলেছিলেন যে তার জন্য নির্ধারিত ১০০০ বছর শেষ হতে আরো ষাট বছর বাকি আছে, কারণ তিনি ঐ ঘটনাটি ভূলে গিয়েছিলেন।

আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ … আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত খুললে দেখা গেল যে, তাতে আদম (আঃ) এবং তাঁর সন্তানরা রয়েছে। আদম (আঃ) বললেনঃ হে আমার পালনকর্তা! এরা কারা? আল্লাহ তা‘আলা বললেনঃ এরা তোমার বংশধর। তাদের সকলের দুই চক্ষুর মধ্যখানে তাদের আয়ুষ্কাল লেখা ছিল। তাদের মাঝে একজন অত্যুজ্জ্বল চেহারার ছিল।” তিনি বললেন, হে আল্লাহ! কে এই লোক? তিনি বলেনঃ সে তোমার সন্তান দাঊদ (আঃ)। আমি তার চল্লিশ বছর বয়স নির্ধারণ করেছি। আদম (আঃ) বললেনঃ হে আল্লাহ! তার আয়ুষ্কাল আপনি আরো বাড়িয়ে দিন। তিনি বললেনঃ আমি তার আয়ুষ্কাল এটাই নির্ধারণ করেছি। আদম (আঃ) বললেনঃ হে প্রভু! আমার আয়ুষ্কাল হতে ষাট বছর আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। আল্লাহ তা‘আলা বললেনঃ এটা তার প্রতি তোমার বদান্যতা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা যত দিন চাইলেন তিনি জান্নাতে থাকলেন, তারপর তাঁকে সেখান হতে (পৃথিবীতে) নামানো হল। আদম (‘আঃ) নিজের বয়সের গণনা করতে থাকলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আদম (‘আঃ)-এর নিকট মালাকুল মাউত (মুত্যুদূত) এসে হাযির হলে তিনি তাকে বললেনঃ আমার জন্য ধার্যকৃত বয়স তো হাজার বছর, যথাসময়ের আগেই তুমি এসেছ। মৃত্যুদূত বললেন, হ্যাঁ, তবে আপনি আপনার বয়স হতে ষাট বছর আপনার বংশধর দাঊদ (‘আঃ)-কে দান করেছেন। আদম (‘আঃ) তা (ভুলে গিয়ে) অস্বীকার করলেন। এজন্য তার সন্তানরাও অস্বীকার করে থাকে। আর তিনি ভুলে গিয়েছিলেন তার তার সন্তানরাও ভুলে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সেদিন হতেই লিখে রাখা ও সাক্ষী রাখার হুকুম দেয়া হয়। {জামে’ আত-তিরমিজি, বই ৪৪, হাদিস ৩৩৬৮}

আদম আঃ শুক্রবারে পৃথিবীতে অবতরণ করেছিল

আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমু‘আর দিন সর্বোত্তম। এ দিন আদম (‘আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিন তাঁকে জান্নাতে দাখিল করা হয়েছে এবং এ দিন তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়।” {সহীহ মুসলিম, বই ৭, হাদীস ২৭/১৮৬১}

পৃথিবীতে আদম (আঃ) এর জীবনযাপন

আদম (আঃ) জানতেন, তিনি জান্নাতের শান্তি ত্যাগ করেছেন। পৃথিবীতে টিকে থাকতে তাকে অনেক  সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পৃথিবীতে চাষাবাদ, নির্মাণ এবং জনবসতি গড়ে তুলতে হয়েছিল তাকে। কাপড় দিয়ে নিজের ইজ্জতের রক্ষা এবং অস্ত্র দিয়ে নিজের জীবন রক্ষার পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানদের বন্য হিংস্র জীবজন্তু থেকেও রক্ষা করতে হয়েছিল তাকে।

সর্বোপরি, তাকে নিজের নাফ্সের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। যেই শয়তান, যে কিনা তাঁর জান্নাত হতে বিতাড়িত করেছিল, সেই শয়তানই প্রতিনিয়ত তাকে এবং তাঁর স্ত্রী-সন্তানদেরকে চিরন্তন জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। ভালো এবং মন্দের লড়াই অব্যাহতই রইলো, তবে যারা আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে তাদের আসলে ভয় পাওয়ার কোনো কারণই নেই। কিন্তু যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে এবং ইবলিসকে অনুসরণ করে তারাও তারই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে।